
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানকে ঘিরে আলোচিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। সরকারের পক্ষ থেকে এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখার কথা বলা হলেও, একটি যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাগত প্রভাব কী হতে পারে, তা নিয়ে বিস্তারিত জাতীয় আলোচনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান, সৌদি আরব ও তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাগত স্বার্থ জড়িত। ফলে কোনো নির্দিষ্ট সামরিক কাঠামোর অংশ হওয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের এই কৌশলগত ভারসাম্যে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
সরকারের পক্ষ থেকে মক্কা চুক্তিকে ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে এবং বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হলে বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হতে পারে—এমন অবস্থান সামনে এসেছে। তবে জাতীয় নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সম্ভাব্য ঝুঁকি কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে, সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
বিশেষ করে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামোর কোনো সদস্য রাষ্ট্র ভবিষ্যতে সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে বাংলাদেশের ওপর কী ধরনের রাজনৈতিক বা সামরিক দায় তৈরি হতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বাংলাদেশকে কি সামরিক সহায়তা দিতে হবে, গোয়েন্দা তথ্য বা লজিস্টিক সহযোগিতা করতে হবে, কিংবা কোনো সদস্য রাষ্ট্র আক্রান্ত হলে বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে—এসব বিষয় চুক্তির শর্তের আলোকে পরিষ্কার হওয়া জরুরি।
বাংলাদেশের জন্য আরও স্পর্শকাতর বিষয় পাকিস্তানের অবস্থান। ভারত ও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে পাকিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করে এমন কোনো প্রতিরক্ষা কাঠামোয় বাংলাদেশের প্রবেশ দিল্লির নিরাপত্তা হিসাবেও নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। পাশাপাশি নদীর পানি, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও নিরাপত্তাসহ বহু ক্ষেত্রে দুই দেশের সরাসরি স্বার্থ জড়িয়ে আছে। ফলে পাকিস্তানের সঙ্গে একই প্রতিরক্ষা কাঠামোয় বাংলাদেশের অবস্থানকে ভারত কীভাবে দেখবে, সেটিও ঢাকার কৌশলগত হিসাবের বাইরে রাখার সুযোগ নেই।
আরও বড় প্রশ্ন তৈরি হতে পারে ভবিষ্যতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত দেখা দিলে। সে পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকতে পারবে? নাকি পাকিস্তানের সঙ্গে একই প্রতিরক্ষা কাঠামোয় থাকার কারণে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা কৌশলগত সহযোগিতার প্রত্যাশা তৈরি হবে?
অন্যদিকে বাংলাদেশ নিরপেক্ষ অবস্থান নিলে সেটি চুক্তির অন্য সদস্যদের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, সেই প্রশ্নও থাকবে। বর্তমানে এমন পরিস্থিতি কাল্পনিক হলেও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নীতি নির্ধারণের সময় সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ সংকট বিবেচনায় নেওয়াই স্বাভাবিক।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি ওই অঞ্চলে কর্মরত এবং দেশের প্রবাসী আয় ও জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গেও মধ্যপ্রাচ্যের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি ভূরাজনৈতিক বা সামরিক সংঘাত বাংলাদেশের নিজস্ব সংঘাত নয়। সৌদি আরব, ইরান, তুরস্ক এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির নিজস্ব নিরাপত্তা স্বার্থ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। বাংলাদেশ কোনো যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামোর সদস্য হলে ভবিষ্যতে এসব সংঘাতের কোনো একটিতে রাজনৈতিক, সামরিক, গোয়েন্দা বা লজিস্টিক সহযোগিতার প্রত্যাশা তৈরি হবে কি না, সেটিও আগেই পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ একই সঙ্গে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে আসছে। এই বহুমুখী সম্পর্ক বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোনো নির্দিষ্ট সামরিক বলয়ে প্রবেশ করলে অন্য অংশীদাররা বাংলাদেশের অবস্থানকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে, তারও পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
সৌদি আরবের সঙ্গে বন্ধুত্ব, তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কিংবা পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক বজায় রাখা এবং একটি বহুপক্ষীয় সামরিক জোটের সদস্য হওয়া একই বিষয় নয়। দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতায় বাংলাদেশ নির্দিষ্ট ক্ষেত্র ও শর্ত নির্ধারণ করতে পারে। কিন্তু যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামোর ক্ষেত্রে অন্য সদস্যদের নিরাপত্তা সংকটও বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে।
ফলে সরকার যদি মনে করে মক্কা চুক্তিতে সম্ভাব্য অংশগ্রহণ বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে না, তাহলে সেই মূল্যায়নের ভিত্তিও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে বাংলাদেশের দায় কী হবে, বিদেশে সেনা পাঠানোর বাধ্যবাধকতা থাকবে কি না, বাংলাদেশের বন্দর বা আকাশসীমা ব্যবহারের সুযোগ থাকবে কি না এবং কোনো সংঘাতে বাংলাদেশ স্বাধীনভাবে নিরপেক্ষ থাকতে পারবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর জাতীয় স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
একটি আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা চুক্তির সিদ্ধান্ত বর্তমান সরকার নিলেও তার প্রভাব বহু বছর স্থায়ী হতে পারে। আজ নেওয়া কোনো প্রতিশ্রুতি ভবিষ্যতের সরকারকেও বহন করতে হতে পারে। তাই এমন সিদ্ধান্তের আগে পূর্ণাঙ্গ জাতীয় নিরাপত্তা মূল্যায়ন, কূটনৈতিক বিশ্লেষণ এবং সামরিক বাধ্যবাধকতার স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার করা জাতীয় স্বার্থের অংশ হতে পারে। তবে সেই সহযোগিতা এমন হওয়া প্রয়োজন, যাতে বাংলাদেশের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ থাকে। কোনো বন্ধুর সংঘাত যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলাদেশের সংঘাতে পরিণত না হয় এবং কোনো সামরিক কাঠামো যেন বাংলাদেশের নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতির ওপর অপ্রয়োজনীয় বাধ্যবাধকতা তৈরি না করে।
তাই মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন শুধু বাংলাদেশ কী পাবে, তা নয়। একই সঙ্গে জানতে হবে—এই চুক্তিতে প্রবেশের বিনিময়ে বাংলাদেশ তার কৌশলগত স্বাধীনতা, আঞ্চলিক ভারসাম্য এবং গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কী হারানোর ঝুঁকি নিচ্ছে?
জাতীয় নিরাপত্তার সিদ্ধান্তের প্রভাব একটি সরকারের মেয়াদে সীমাবদ্ধ থাকে না। ভুল কৌশলগত সিদ্ধান্তের মূল্য অনেক সময় পুরো রাষ্ট্রকে দীর্ঘদিন বহন করতে হয়।